x 
Empty Product

প্রবাদ আছে আমে ধান, আর তেঁতুলে বান। বলা হয়ে থাকে যেবছর ধান হয়; সেবছর আমও ভালো হয়। ধানের বাম্পার ফলনের সঙ্গে সঙ্গে এবার আমেরও বাম্পার ফলন হচ্ছে।

এবার দেশে  ৭ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিকটন আম উৎপাদন হতে যাচ্ছে। গত বছরের উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিকটন। এরইমধ্যে বাজার উঠতে শুরু করেছে আম। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে আমকেই সবেচেয়ে সুস্বাদু এবং লোভনীয় ফল বলে মনে করা হয়।আমের কদর প্রাচ্য-পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও সমান।

আমের অন ইয়ার এবং অফ ইয়ার নামে দুটি শব্দ ব্যাপকভাবে চালু আছে। এবার আমের অন ইয়ার। যে বছর ফলন ভালো হয় তাকে অন ইয়ার বলে এবং যে বছর ফলন ততটা ভালো হয় না তাকে অফ ইয়ার বলা হয়ে থাকে। যদিও কৃষি বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন। তারা বলেছেন আমের অফ ইয়ার অন ইয়ার বলে কিছু নেই। সবটাই নির্ভর করে প্রকৃতির উপর।

আম একটি অর্থকরী কৃষিপণ্য। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কমবেশি আম উৎপাদিত হয়। তবে পরিমাণ ও মানের দিক থেকে এগিয়ে আছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। প্রকৃতি ও জলবায়ুগত কারণে এই অঞ্চলে উৎকৃষ্টজাতের আমের ফলন হয়। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের আমের খ্যাতি দেশজোড়া। শুধু তাই নয়- আমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এই অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা। বিশেষ করে আমের মৌসুমে চাঙ্গা হয়ে উঠে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি। মৌসুমী কর্মসংস্থান হয় লক্ষাধিক মানুষের। আম মৌসুমে গ্রামজনপদ রূপ নেয় উৎসবের।   

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুকূল আবহাওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই এবার রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আমবাগানগুলি ব্যাপকভাবে মুকুলিত হয়।ছোটখাটো্ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু মুকুল নষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত গাছে যে পরিমাণ আম অবশিষ্ট আছে, তাতে আমের বাম্পার ফলন হচ্ছে । চাষিরা আগের চেয়ে বেশি সচেতন বলে মুকুল রক্ষায় তাদের কার্যকরী পরিচর্যা আমের ভাল ফল দিচ্ছে। 

আমের ফলন কেমন হবে

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে , রাজশাহী অঞ্চলে ৪৮ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। যা থেকে ৫ লাখ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এবার হেক্টর প্রতি আমের ফলন ধরা হয়েছে ১৩ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর চাষিরা প্রতি হেক্টরে আমের ফলন পেয়েছিল  ৮ হাজার মেট্রিক টন।

সূত্র মতে, রাজশাহী অঞ্চলে মোট আম বাগানের প্রায় অর্ধেকই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এ জেলায়

২৪ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এই পরিমাণ বাগান থেকে এ বছর ২ লাখ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে রাজশাহী জেলায় ৮ হাজার ৬৬৭ হেক্টর  বাগান থেকে উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯০ হাজার ৩৫০ মেট্রিকটন।

 অন্যদিকে নওগাঁ জেলায় ৪ হাজার ৮২৫ হেক্টর বাগানে ৭৭ হাজার ২০০ মেট্রিকটন, নাটোর জেলায় ৩ হাজার ৭০০ হেক্টরে ৪২ হাজার ৮৪৬ মেট্রিকটন, বগুড়ায় ৩ হাজার ৪৭০ হেক্টরে ৩১ হাজার ২৩০ টন, জয়পুরহাটে ৬২২ হেক্টর বাগানে ৪ হাজার ১৩৬ টন, পাবনা জেলায় ১ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার ৩৭৮ টন এবং সিরাজগঞ্জে ২ হাজার ৫৫ হেক্টর জমির আমবাগানে ২০ হাজার সাড়ে ৫০০ টন  আম হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমের ফলন হয়। এসব জেলার আমও জাতীয় উৎপাদনে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক অসীম কুমার পাল জানান, এবাi রাজশাহী অঞ্চলে আমের ফলন ভালো হবে। কয়েকদিন পরেই রাজশাহী অঞ্চলের  আম বাজারে আসবে। আমকেন্দ্রিক বাণিজ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠবে এই অঞ্চলের অর্থনীতি। তিনি  আরও বলেন,এবার মৌসুমের শুরু থেকেই মাঝেমাঝে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আম পুষ্ট হয়েছে। ফলে আমের স্বাদও ভালো হবে। পুষ্ট হওয়ায় আমের মোট ফলনও বাড়বে। সেইসঙ্গে আম নষ্ট হবে কম,পুষ্টিগুণও বেশি পাবে ভোক্তা।

আমের সব বাহারি নাম

প্রায় আড়ইশ জাতের আম উৎপন্ন হয় রাজশাহী অঞ্চলে। এগুলির বেশিরভাগই দেশী বা স্থানীয় জাতের। তবে কিছু কিছু হাইব্রিড জাতের আমও এখন স্থান করে নিয়েছে রাজশাহী অঞ্চলের বাগানগুলিতে। তবে ফজলিকে আমের রাজা বলা হলেও স্থানীয় জাতের ল্যাংড়া, গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত আম স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। এসব আমের দামও বেশি। এসব জাতের আম স্বল্পসময়ে বাজারে আসে আবার দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। এছাড়াও বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, গুটি, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লখনা ও মোহনভোগ জাতের আম বেশি হয় এই অঞ্চলে। রাজশাহী অঞ্চলের গাছে গাছে বাহারি জাতের আম এখন দেশের মানুষের রসনা মেটাতে প্রস্তুত হচ্ছে। আমচাষিদের মনে এখনই উঁকি দিচ্ছে মুনাফার আগাম বার্তা।

আমযজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু  

কয়েকদিন পরেই রাজশাহী অঞ্চলের মোকামগুলি আমে সয়লাe হয়ে যাবে। আমযজ্ঞে মেতে উঠবে হাজার হাজার মানুষ। চাষিরা বাগান থেকে আম নামিয়ে আনবেন মোকামে। সেখান থেকে ব্যাপারিরা কিনে বিভিন্ন যানবাহনে পাঠাবেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে মে মাসের শেষ দিকে আগামজাতের আমগুলি বাজারে উঠবে। প্রথমে আসবে গোপালভোগ ও রানীপছন্দ| এর এক সপ্তাহের মধ্যেই লখনা, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, দুধসর, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসবে। মৌসুমের শেষে ফজলি এবং সবশেষ বাজারে উঠবে আশ্বিনাজাতের আম। আম শেষ হবে জুলাই মাসের শেষদিকে। পুরো তিনমাসে শত শত কোটি টাকার আম বাণিজ্য হবে। এই বাণিজ্যেই সারাবছর চাঙ্গা থাকবে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি।

আমের বড় মোকাম

দেশে আমের দুটি বড় মোকাম রয়েছে। একটি রাজশাহীর বানেশ্বর। অন্যটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট। এ দুটি মোকাম থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ট্রাক আম চালান হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। কখনও হয় আরও বেশি। হাজারো মানুষ এসব কাজে নিয়োজিত থাকেন। দিনরাত চলে এই কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারিরা পুরো তিন মাসই এ দুটি মোকামে অবস্থান করেন।

কুমিল্লার বুড়িচং এর শহীদুল্লাহ ব্যাপারি জানালেন, ঢাকার বাদামতলী হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার। বিভিন্ন স্থান থেকে আম এনে জড়ো করা হয় এখানে। এখান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আম নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন ঢাকা ও শহরতলীতে। আশেপাশের জেলাতেও আম যায় এখান থেকে। এছাড়া চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট ও কুমিল্লাও আমের বড় বাজার। সারাদেশের ব্যাপারিরা এসব বাজারে আম নিয়ে হাজির হন বিক্রির জন্য।যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ঢাকার ভোক্তারা তাজা ও টাটকা আম খাওয়ার সুযোগ পান। আবার এসব আমের দামও ভাল পান চাষিরা।  

 

আমভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানির সম্ভাবনা

দেশে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হলেও সিংহভাগই সরাসরি ভোগ করেন ভোক্তারা। আমকেন্দ্রিক শিল্পের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও তা সামান্যই। রাজশাহী অঞ্চলের আমের বিপুল চাহিদা রয়েছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু উপযোগী নীতিমালার অভাবে আম রপ্তানি করা যায় না। আম থেকে উন্নতমানের আচার, সস, জেলি, জুসসহ মুখরোচক খাদ্যপণ্য তৈরি সম্ভব। জানা যায় নাটোরে প্রাণ গ্রুপ  একটি  প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুললেও সেখানে উপাদিত আমের সামান্য অংশই কাজে লাগানো হয়।  

জানা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে পাঠানো আমের নমুনা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে দুবছর আগে গৃহীত হলেও বিদেশের বিশাল বাজার ধরতে পারছে না এই অঞ্চলের আম ব্যবসায়ীরা। উদ্যোগ নেই সরকারিভাবেও।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এরমধ্যে বিপুল পরিমাণ আম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদেশে উপহার হিসেবে পাঠানো ছাড়া কখনই রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত প্রতি বছর ৪১ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানি করে। এমনকি পাকিস্তানও প্রতি বছর গড়ে ৪৭ হাজার মেট্রিক টন আম বিদেশে পাঠায়।

ভারত ও পাকিস্তানের মত বাংলাদেশে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানির জন্য সরকারি কৃষিজ উৎপাদন রপ্তানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হরটেক্স ফাউন্ডেশন একাধিকার উদ্যোগ নিয়েওব্যর্থহয়।

২০১০ সালের ৩০ জুন হরটেক্স ফাউন্ডেশন চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র উদ্ভাবিত বারি-২ জাতের আমের নমুনা পাঠিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে। নমুনা পাঠানোর মাত্র দুসপ্তাহের মাথায় ১২ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এক ফ্যাক্সবার্তার মাধ্যমে জানানো হয়, উৎকৃষ্টমানের এই আমের নমুনা তাদের খুব পছন্দ। কিন্তু এরপর দুবছর অতিবাহিত হলেও এবিষয়ে তেমন কোন অগ্রগতি নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যান গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২ তম হলেও এখানে আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় বিদেশে আম রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান হলে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে লাভবান হবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিরা।

আম চাষিদের কথা    

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সত্রাজিতপুর গ্রামের আদর্শ আম চাষি হারুনুর রশীদ বলেন, আম এই জেলার মানুষের জীবনজীবিকার প্রধান অবলম্বন। আমবাগান বিক্রি করেই হাজার হাজার পরিবার চলে। জাতীয় অর্থনীতিতেও আমের ভুমিকা আছে। কিন্তু আম চাষিদের জন্য সরকারি কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। তিনি বলেন,  বাংলাদেশের চাষিরা প্রাচিন পদ্ধতিতে আম চাষ করেন। এজন্য তারা আমের ফলন কম পান। ফড়িয়া ব্যাপারিরাই আমের সবটুকু লাভ তুলে নিয়ে যান। কৃষি বিভাগ আমের ফলন হিসাব করা ছাড়া আর কোন কাজ করে না। 

কানসাটের আমচাষি মাহাতাবউদ্দিন বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ না করা, যুগপোযোগী প্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে আম রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা। অথচ বাংলাদেশ থেকে ফজলি, হিমসাগর, বারি-২, ল্যাংড়া, বারি-৭ জাতের আম বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিওসার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, বিদেশে আম রপ্তানির বিষযটি মাথায় রেখে তারা আম চাষি ও এর সাথে সংশ্লিষ্টদের সভা-সেমিনার করে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।

 

প্রবাদে আছে আমে ধান, আর তেঁতুলে বান। বলা হয়ে থাকে যে বছর ধান হয়; সেবছর আমও ভালো হয়। ধানের বাম্পার ফলনের সঙ্গে সঙ্গে এবার আমেরও বাম্পার ফলন হচ্ছে। ফলে রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আম চাষ যেসব এলাকায় বেশি হয় সে এলাকার চাষিদের মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ। এরইমধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে আম। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে আমকেই সবেচেয়ে সুস্বাদু এবং লোভনীয় ফল বলে মনে করা হয়। আমের কদর প্রাচ্য-পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও সমান। আমের অন ইয়ার এবং অফ ইয়ার নামে দুটি শব্দ ব্যাপকভাবে চালু আছে। এবার আমের অন ইয়ার। যে বছর ফলন ভালো হয় তাকে অন ইয়ার বলে এবং যে বছর ফলন ততটা ভালো হয় না তাকে অফ ইয়ার বলা হয়ে থাকে। যদিও কৃষি বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, আমের অফ ইয়ার অন ইয়ার বলে কিছু নেই। সবটাই নির্ভর করে প্রকৃতির উপর। আম একটি অর্থকরী কৃষিপণ্য। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কমবেশি আম উৎপাদিত হয়। তবে পরিমাণ ও মানের দিক থেকে এগিয়ে আছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। প্রকৃতি ও জলবায়ুগত কারণে এই অঞ্চলে উৎকৃষ্টজাতের আমের ফলন হয়। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের আমের খ্যাতি দেশজোড়া। শুধু তাই নয়, আমকে কেন্দ্র পর)
করে আবর্তিত হয় এই অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা। বিশেষ করে আমের মৌসুমে চাঙ্গা হয়ে উঠে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি। মৌসুমী কর্মসংস্থান হয় লক্ষাধিক মানুষের। আম মৌসুমে গ্রাম-জনপদ রূপ নেয় উৎসবের। সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুকূল আবহাওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই এবার রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আমবাগানগুলি ব্যাপকভাবে মুকুলিত হয়। ছোটখাটো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু মুকুল নষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত গাছে যে পরিমাণ আম অবশিষ্ট আছে, তাতে আমের বাম্পার ফলন হচ্ছে। চাষিরা আগের চেয়ে বেশি সচেতন বলে মুকুল রক্ষায় তাদের কার্যকরী পরিচর্যা আমের ভাল ফল দিচ্ছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে ৪৮ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। যা থেকে ৫ লাখ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এবার হেক্টর প্রতি আমের ফলন ধরা হয়েছে ১৩ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর চাষিরা প্রতি হেক্টরে আমের ফলন পেয়েছিল ৮ হাজার মেট্রিক টন। সূত্র মতে, রাজশাহী অঞ্চলে মোট আম বাগানের প্রায় অর্ধেকই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এ জেলায় ২৪ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এই পরিমাণ বাগান থেকে এ বছর ২ লাখ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে রাজশাহী জেলায় ৮ হাজার ৬৬৭ হেক্টর বাগান থেকে উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯০ হাজার ৩৫০ মেট্রিকটন। অন্যদিকে নওগাঁ জেলায় ৪ হাজার ৮২৫ হেক্টর বাগানে ৭৭ হাজার ২০০ মেট্রিকটন, নাটোর জেলায় ৩ হাজার ৭০০ হেক্টরে ৪২ হাজার ৮৪৬ মেট্রিকটন, বগুড়ায় ৩ হাজার ৪৭০ হেক্টরে ৩১ হাজার ২৩০ টন, জয়পুরহাটে ৬২২ হেক্টর বাগানে ৪ হাজার ১৩৬ টন, পাবনা জেলায় ১ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার ৩৭৮ টন এবং সিরাজগঞ্জে ২ হাজার ৫৫ হেক্টর জমির আম বাগানে ২০ হাজার সাড়ে ৫০০ টন আম হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমের ফলন হয়। এসব জেলার আমও জাতীয় উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক অসীম কুমার পাল জানান, এবার রাজশাহী অঞ্চলে আমের ফলন ভালো হবে। কয়েকদিন পরেই রাজশাহী অঞ্চলের আম বাজারে আসবে। আমকেন্দ্রিক বাণিজ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠবে এই অঞ্চলের অর্থনীতি। তিনি আরও বলেন, এবার মৌসুমের শুরু থেকেই মাঝেমাঝে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আম পুষ্ট হয়েছে। ফলে আমের স্বাদও ভালো হবে। পুষ্ট হওয়ায় আমের মোট ফলনও বাড়বে। সেইসঙ্গে আম নষ্ট হবে কম, পুষ্টিগুণও বেশি পাবে ভোক্তা। প্রায় আড়াইশ জাতের আম উৎপন্ন হয় রাজশাহী অঞ্চলে। এগুলোর বেশিরভাগই দেশী বা স্থানীয় জাতের। তবে কিছু কিছু হাইব্রিড জাতের আমও এখন স্থান করে নিয়েছে রাজশাহী অঞ্চলের বাগানগুলিতে। তবে ফজলিকে আমের রাজা বলা হলেও স্থানীয় জাতের ল্যাংড়া, গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত আম স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। এসব আমের দামও বেশি। এসব জাতের আম স্বল্পসময়ে বাজারে আসে আবার দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। এছাড়াও বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, গুটি, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লখনা ও মোহনভোগ জাতের আম বেশি হয় এই অঞ্চলে। রাজশাহী অঞ্চলের গাছে গাছে বাহারি জাতের আম এখন দেশের মানুষের রসনা মেটাতে প্রস্তুত হচ্ছে। আমচাষিদের মনে এখনই উঁকি দিচ্ছে মুনাফার আগাম বার্তা। কয়েকদিন পরেই রাজশাহী অঞ্চলের মোকামগুলি আমে সয়লাব হয়ে যাবে। আমযজ্ঞে মেতে উঠবে হাজার হাজার মানুষ। চাষিরা বাগান থেকে আম নামিয়ে আনবেন মোকামে। সেখান থেকে ব্যাপারিরা কিনে বিভিন্ন যানবাহনে পাঠাবেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে মে মাসের শেষ দিকে আগামজাতের আমগুলি বাজারে উঠবে। প্রথমে আসবে গোপালভোগ ও রানীপছন্দ। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই লখনা, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, দুধসর, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসবে। মৌসুমের শেষে ফজলি এবং সবশেষ বাজারে উঠবে আশ্বিনাজাতের আম। আম শেষ হবে জুলাই মাসের শেষদিকে। পুরো তিনমাসে শত শত কোটি টাকার আম বাণিজ্য হবে। এই বাণিজ্যেই সারাবছর চাঙ্গা থাকবে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি। দেশে আমের দুটি বড় মোকাম রয়েছে। একটি রাজশাহীর বানেশ্বর অন্যটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট। এ দুটি মোকাম থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ট্রাক আম চালান হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। কখনও হয় আরও বেশি। হাজারো মানুষ এসব কাজে নিয়োজিত থাকেন। দিনরাত চলে এই কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারিরা পুরো তিন মাসই এ দুটি মোকামে অবস্থান করেন। কুমিল্লার বুড়িচং এর শহীদুল্লাহ ব্যাপারি জানালেন, ঢাকার বাদামতলী হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার। বিভিন্ন স্থান থেকে আম এনে জড়ো করা হয় এখানে। এখান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আম নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন ঢাকা ও শহরতলীতে। আশপাশের জেলাতেও আম যায় এখান থেকে। এছাড়া চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট ও কুমিল্লাও আমের বড় বাজার। সারাদেশের ব্যাপারিরা এসব বাজারে আম নিয়ে হাজির হন বিক্রির জন্য। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ঢাকার ভোক্তারা তাজা ও টাটকা আম খাওয়ার সুযোগ পান। আবার এসব আমের দামও ভাল পান চাষিরা। দেশে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হলেও সিংহভাগই সরাসরি ভোগ করেন ভোক্তারা। আমকেন্দ্রিক শিল্পের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও তা সামান্যই। রাজশাহী অঞ্চলের আমের বিপুল চাহিদা রয়েছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু উপযোগী নীতিমালার অভাবে আম রপ্তানি করা যায় না। আম থেকে উন্নতমানের আচার, সস, জেলি, জুসসহ মুখরোচক খাদ্যপণ্য তৈরি সম্ভব। জানা যায়, নাটোরে প্রাণ গ্রুপ একটি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুললেও সেখানে উপাদিত আমের সামান্য অংশই কাজে লাগানো হয়। জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে পাঠানো আমের নমুনা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে দুবছর আগে গৃহীত হলেও বিদেশের বিশাল বাজার ধরতে পারছে না এই অঞ্চলের আম ব্যবসায়ীরা। উদ্যোগ নেই সরকারিভাবেও।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এরমধ্যে বিপুল পরিমাণ আম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদেশে উপহার হিসেবে পাঠানো ছাড়া কখনই রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত প্রতি বছর ৪১ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানি করে। এমনকি পাকিস্তানও প্রতি বছর গড়ে ৪৭ হাজার মেট্রিক টন আম বিদেশে পাঠায়। ভারত ও পাকিস্তানের মত বাংলাদেশে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানির জন্য সরকারি কৃষিজ উৎপাদন রপ্তানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হরটেক্স ফাউন্ডেশন একাধিকার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়। ২০১০ সালের ৩০ জুন হরটেক্স ফাউন্ডেশন চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র উদ্ভাবিত বারি-২ জাতের আমের নমুনা পাঠিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে। নমুনা পাঠানোর মাত্র দুসপ্তাহের মাথায় ১২ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এক ফ্যাক্সবার্তার মাধ্যমে জানানো হয়, উৎকৃষ্টমানের এই আমের নমুনা তাদের খুব পছন্দ। কিন্তু এরপর দুবছর অতিবাহিত হলেও এবিষয়ে তেমন কোন অগ্রগতি নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যান গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম হলেও এখানে আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় বিদেশে আম রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান হলে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে লাভবান হবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সত্রাজিতপুর গ্রামের আদর্শ আম চাষি হারুনুর রশীদ বলেন, আম এই জেলার মানুষের জীবনজীবিকার প্রধান অবলম্বন। আমবাগান বিক্রি করেই হাজার হাজার পরিবার চলে। জাতীয় অর্থনীতিতেও আমের ভুমিকা আছে। কিন্তু আম চাষিদের জন্য সরকারি কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চাষিরা প্রাচীন পদ্ধতিতে আম চাষ করেন। এজন্য তারা আমের ফলন কম পান। ফড়িয়া ব্যাপারিরাই আমের সবটুকু লাভ তুলে নিয়ে যান। কৃষি বিভাগ আমের ফলন হিসাব করা ছাড়া আর কোন কাজ করে না।

কানসাটের আমচাষি মাহাতাবউদ্দিন বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ না করা, যুগপোযোগী প্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে আম রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা। অথচ বাংলাদেশ থেকে ফজলি, হিমসাগর, বারি-২, ল্যাংড়া, বারি-৭ জাতের আম বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিওসার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, বিদেশে আম রপ্তানির বিষয়টি মাথায় রেখে তারা আম চাষি ও এর সাথে সংশ্লিষ্টদের সভা-সেমিনার করে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।

জৈষ্ট্যে মাস মধুর মাস।আর এ মধু মাসে সাতক্ষীরার ফলের আড়তগুলোতে আমের জমজমাট কেনাবেচা হচ্ছে। গতকাল বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে আড়তগুলোতে শুধু আম আর আম।প্রতিদিন হাজার হাজার মন বিভিন্ন প্রজাতের কাঁচা পাঁকা আম বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা সাতক্ষীরায় আসছেন আম সংগ্রহ করতে। তারা এখানকার আম কিনে তা আবার ঢাকা চট্টোগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। তবে গত বছেরের তুলনায় এবার সাতক্ষীরায় আমের আমদানি যেমন বেশি তেমন দাম ও কম ।

আমের সরবারহ এত বেশি কেন জানতে চাইলে ব্যাবসায়ীরা জানান, আবহাওয়া বিরুপ প্রভাবের কারণে যারা আম গাছ কিনে রেখেছেন তারা আগে ভাগে কাচা আম পেড়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

গতকাল সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড় বাজার ফল ও কাচামাল বিক্রির আড়তগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে বিপুল পরিমান আমের আমদানি। এরমধ্যে হিমসাগর, গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, সিদুররাঙ্গা, লতা ও দেশী বোম্বাই উল্লেখযোগ্যা। সরবরাহ বেশির কারনে এবার পাইকারীতে আমের দাম গত বছরের তুলনায় অনেকাংশে কম বলে জানান ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।

সুলতানপুর বড় বাজারের কাঁচা মালের আড়ত মর্জিনা ভান্ডারে হিমসাগর আম বিক্রি হয়েছে প্রতি মন পাইকারী ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, গোবিন্দভোগ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে। এছাড়া সিদুর রাঙ্গা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা ও অন্যান্য আম ৯০০ শত থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তবে গত বছর এসময় হিমসাগর আম বিক্রি হয়েছে প্রতি মন পাইকারী ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা ও গোবিন্দভোগ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে। আড়তদার কামরুল ইসলাম জানান, গত বছরের তুলনায় এবার সাতক্ষীরাতে আমের সরবরাহ খুব বেশি। তাছাড়া জেলায় আমের উৎপাদন অনেক ভালো। যে কারনে আমের দামটাও কিছুটা কম এবার। পাইকারী আম ব্যবসায়ী নারায়নগঞ্জের জাহাঙ্গীর আলম জানান, গতকাল সুলতানপুর বড় বাজার থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ৩ হাজার মন আম ক্রয় করেন তিনি। তিনি জানান, এসব আম ঢাকা ও চট্ট্রোগ্রাম সহ বিভিন্ন এলাকাতে সরবরাহ করবেন। তিনি জানান, প্রতি বছরেই সাতক্ষীরা জেলা থেকে আম কিনে তা দেশের অন্যন্য জেলায় বিক্রি করেন।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় সাতটি উপজেলাতে ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির আম চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১ হাজার ২৮১ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার ৮১০ মেট্রিকটন, কলারোয়ায় ২৭৫ হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৩০০ মেট্রিকটন, তালায় ৬২৭ হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৫২১ মেট্রিকটন, দেবহটায় ৩৯৮হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার ৯৭০ মেট্রিকটন, কালিগঞ্জে ৮৮৭ হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার ৬৪৪ মেট্রিকটন, আশাশুনিতে ১২০ হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ২০০ মেট্রিকটন ও শ্যামনগরে ১৩২হেক্টর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। তবে এবার সাতক্ষীরায় আমের ফলন যা তাতে করে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন জেলা কৃষি সম্প্রাসরন অদিপ্তর।

আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ায় জমে উঠেছে আমের বাজার। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় হাজার কোটি টাকার আম ব্যবসা নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এবার বৈরী আবহাওয়া এবং আমের অনইয়ার হওয়ায় জেলায় প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হবে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। জেলার বৃহত্তম আমবাজার কানসাট,

শিবগঞ্জ বাজার, রহনপুর, মলি্লকপুর, ভোলাহাট ও জেলা শহরের সদরঘাট এখন ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত আম চাষি ও ব্যাপারীদের ভিড়ে মুখরিত থাকছে। বাগান থেকে আম পাড়া, টুকরি তৈরি ও ট্রাকবোঝাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকান্ডে মেতে উঠেছেন বাজারের লক্ষাধিক আম চাষি ও ব্যবসায়ী। সুস্বাদু আম কেনার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চৌমুহনী, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে এই আম প্রধান এলাকায় আসা শুরু করেছেন। লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও হাজার কোটি টাকার লেনদেনে চাঙা হয়ে উঠেছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি।

কৃষি বিভাগের ধারণা, জেলায় ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদন হলে এর মূল্য হবে বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এর পাশাপাশি পরিবহন, হোটেল ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ব্যবসা হবে প্রায় কোটি টাকার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম জানান, শুরুতে অনাবৃষ্টি আর টানা খরায় বিপাকে পড়েছিল আম চাষিরা। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় আম ব্যবসায়ীরা আমের ফলন নিয়ে বেজায় খুশি। জেলার ৫টি উপজেলায় ২৩ হাজার ৮শ' হেক্টর জমিতে প্রায় ১৭ লাখ ৮৫ হাজার আম গাছ রয়েছে। তবে আম ব্যবসায়ীরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টানা খরা আর অনাবৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে পড়লেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ঝড়ের মুখে পড়েনি আম বাগানগুলো।

জানা গেছে, এবার দেরিতে আম পাকায় বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে গোপালভোগ, খিরসাপাত, খুদি খিরসা, বৃন্দাবনি, কুয়াপাহাড়ী, মধুচুষকি, মিশরিকান্ত, লাল সিদুরি, সাটিয়ারক্যাড়া, হিমসাগরসহ আগাম জাতের গুটিআম। গোপালভোগ ১৪০০-১৬০০, খিরসাপাত ১৫০০-১৬০০, গুটিআম ৮০০-৯০০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় এবার আম ব্যবসায়ীরা খুশি। সদরঘাটের আম ব্যবসায়ী হারুন জানান, জুনের প্রথমেই সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং বিভিন্ন জাতের আম বাজারে ব্যাপকহারে আসায় আমের বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে।

কানসাটের আম ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, এবারে জেলায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আমের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট। প্রতিবছর আম গাছে মুকুল ও গুটি আসা পর্যন্ত আম বাগানগুলো কয়েক দফা বেচাকেনা হলেও এবার দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হাজার কোটি টাকার আম বাগান বেচাকেনা নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আম ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে শিবগঞ্জে সামপ্রতিক সময়ে সহিংসতায় ৮ জন নিহত, একাধিক সংঘর্ষ, গুপ্ত হামলাসহ অস্থিরতা বিরাজ করায় জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাটে আম নিয়ে আসা চাষিরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কানসাটের মকবুল হোসেন জানান, এবার বাজারে আমের ব্যাপক আমদানি থাকলেও রাজনীতি কর্মসূচিতে ট্রাক ভাঙচুর ও অগি্নসংযোগের ঝুঁকির কারণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আম নিয়ে যেতে আম ব্যবসায়ীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজারে আমের দাম বেড়েই থাকছে।