x 
Empty Product
Sunday, 01 December 2013 08:59

খাদ্যে ফরমালিন : টাকা দিয়ে মৃত্যু কেনা!

Written by 
Rate this item
(0 votes)

Rajshahi Mango‘ফিরিয়ে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর’- আর কিছুদিনের মধ্যে এভাবেই বলতে হবে সবাইকে। যেভাবে নগর জীবনের বিড়ম্বনা বাড়ছে তাতে এ কথা না বলে থাকার কোনো উপায় নেই। নগরে চলাফেরার নানা সমস্যার সঙ্গে যে বিষয়টা মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত করছে তা হচ্ছে রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্য। এর ফলে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে জীবনের ঝুঁকি। আগে বলা হতো কিসে ফরমালিন আছে। কি কি খাওয়া যাবে না। আর এখন পরিস্থিতি উল্টো। এখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কিসে নেই ফরমালিন। এক শ্রেণীর লোভীরা মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করে শুধু মুনাফার জন্য করে চলেছে বিজ্ঞানের অপব্যবহার। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে দরকারি খাদ্যপণ্যগুলোতেও হাত পড়েছে এ হায়েনাদের। রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ফল, তরকারি, দুধের মতো প্রতিদিনের আবশ্যক খাবারগুলোকে জীবনের জন্য হুমকিতে রূপান্তরিত করেছে এরা। রাসায়নিক মিশ্রিত এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে মানুষ। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ চেপে বসছে কাঁধে। না খেয়ে থাকতে পারছে না মানুষ। তাই টাকা দিয়ে মৃত্যু কিনতে বাধ্য হচ্ছে সবাই।

খাবারে বিষ হিসেবে এখন সবচেয়ে বেশি কদর ফরমালিনের। ফরমালিন দিয়ে খাদ্যপণ্য পচনের হাত থেকে রক্ষা করেন ব্যবসায়ীরা। বাজারে আম যদি পাঁচ থেকে সাত দিন রাখতে হয় তাহলে তিন দফা ফরমালিন স্প্রে করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের একজন ফল ব্যবসায়ী এমনই তথ্য দিলেন। তিনি জানান, আম যখন গাছ থেকে পাড়া হয় তখনই একদফা ফরমালিন দেয়া হয়। এর পর এগুলো প্যাকেট হয়ে শহরে আসে। শহরে এসে পৌঁছাতে দেরি হলেও যাতে পচন না ধরে তাই প্রথম দফায় ওই ফরমালিন দেয়া হয়। পাইকাররা আমের ঝুড়ির মুখ খুলে কিংবা যদি দেখেন আম নরম তাহলে সব বের করে আরেক দফা ফরমালিন স্প্রে করেন। যাতে খুচরা দোকানগুলোতে পৌঁছানো পর্যন্ত আমের কোনো ক্ষতি না হয়। খুচরা দোকানিরা ওই অবস্থায় আম বিক্রি শুরু করেন। আম নরম হলে খুচরা দোকানেও ফরমালিন স্প্রে করা হয় আরও কিছুদিন আম রক্ষা করার জন্য। গাছে পানি স্প্রে করার জন্য ব্যবহৃত কন্টেইনার দিয়েই এ কাজ সারা হয়। মোট তিন দফা স্প্রে হলে সাত-দশ দিনে আমের কিছু হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিমাণ ফরমালিন মানবদেহে উচ্চমাত্রার ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।

ফরমালিন হচ্ছে রাসায়নিক উপাদান ফরমালডিহাইডের জলীয় মিশ্রণ। এতে মিথানলও থাকে। ফরমালিন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চামড়া, টেক্সটাইল, মেলামাইন, পোলট্রি ও হ্যাচারি শিল্প, ল্যাবরেটরি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কাঠ ও প্লাইউড শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফরমালিন ব্যবহার হয়। কিন্তু এখন ফল তাজা রাখতেই মূলত ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন।

আম, কলা, খেজুর, পেঁপে, আনারস, মালটা, আপেল, আঙ্গুর এবং অন্যান্য ফলে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কীটনাশক, ইথেফেন, ফরমালিন, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামক। মাছে ও টমেটোতে ফরমালিন, শাকসবজিতে কীটনাশক ও ফরমালিন, শুঁটকিতে ডিডিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। মিষ্টিতে কাপড়ের রং, আলকাতরা এবং কৃত্রিম মিষ্টিদায়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি মুড়ি ও চিড়াতেও রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হয়।

Rajshahi Mango

বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত প্যাকেটজাত খাদ্য যেমন ফলের রস, স্ন্যাক্সফুড, জ্যাম-জেলি, আচার-চাটনিতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হয় এবং সেমাই ও নুডলসে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। দুধেও ফরমালিনের ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি চালেও ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। বরফের মধ্যে দেয়া হচ্ছে ফরমালিন। এতে করে বরফের মধ্যে রাখা মাছে আর আলাদা করে ফরমালিন দেয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।

খাদ্য ভেজালিকরণ উপাদানগুলো মানবদেহের নানা ক্ষতির কারণ। বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাছ, ফল, মাংস এবং দুধে ফরমালিন প্রয়োগের ফলে ক্যান্সার, বাল্য হাঁপানি এবং চর্ম রোগ হয়। শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য এর ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মক। অতি স্বল্প পরিমাণ ফরমালডিহাইড গ্যাস ব্যবহারেও ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়া হয়। শ্বাসের সঙ্গে এই গ্যাস গ্রহণ নিউমোনিয়ার সংক্রমণের কারণ। ফরমালিন সেই বিরল বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা গ্রহণের ফলে মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। অনেকেই এখন এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তাদের পরিবার-পরিজন সর্বস্বান্ত হচ্ছে। তাছাড়া রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ হাই এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানবদেহে নানা ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। এগুলোর অনেক কারণ স্পষ্ট জানাও যায়নি। তবে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক যে ক্যান্সারের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম তা প্রমাণিত। ফরমালিনযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানুষের শরীরে যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে পাকস্থলীতে প্রদাহ, লিভারের ক্ষতি, অস্থিমজ্জা জমে যায়। যা গ্যাস্ট্রিক ও পরবর্তীতে ক্যান্সার এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গলায় ক্যান্সার ও রক্ত ক্যান্সারের মতো ঘটনাও এ থেকে ঘটতে পারে। সরকারের উচিত খাদ্যপণ্যে ফরমালিন ব্যবহার যে কোনো মূল্যে নিষিদ্ধ করা।’

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যান্সারের ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার রিপোর্টের দেয়া তথ্যমতে, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে তা আবারও দ্বিগুণ হবে এবং এ হার তিনগুণে পৌঁছবে ২০৩০ সালের মধ্যে। সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১.৩ শতাংশ হারে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তবে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান, ভুটানের মতো দেশগুলোয় ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৮ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় আমাদের মতো মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তামাকজাত দ্রব্য অধিকমাত্রায় গ্রহণ, উচ্চমানের চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং খাদ্যে ও বায়ুতে নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস সোসাইটির দেয়া তথ্যমতে, ভেজাল খাদ্য খেয়ে দেশে প্রতি বছর তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস ও ২ লাখ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও গর্ভবতীরা। ভেজালের কারণে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ প্রতি বছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা কয়েক লাখ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারকন্টিনেন্টাল মার্কেটিং সার্ভিসেস এর গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধের বাজার প্রতি বছর শতকরা ২০ ভাগ হারে বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ডিন অধ্যাপক এবিএম ফারুক বলেন, ‘ফরমালিন এতটাই ক্ষতিকর যে, শুধু প্রতিরক্ষামূলক পোশাক যেমন গ্লাভস পরিধানের মাধ্যমে এটা ব্যবহার করতে হয়। বায়ু চলাচলপূর্ণ এলাকায় মুখ বন্ধ পাত্রে এটি সংরক্ষণ করা উচিত। এর থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া চোখ ও শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই জিনিস যদি ফলের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে তাহলে ফলের গুণাবলি দূরে থাক শরীর তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা হারাবে।’

নানা ধরনের বিষাক্ত ও নিম্নমানের খাদ্যের কারণে আগামী প্রজন্ম বিভিন্ন গুরুতর অসুখের ঝুঁকি নিয়ে বড় হচ্ছে। এসব খাদ্য গ্রহণে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। কিছু খাবার এমনই বিষাক্ত যে তা ডিএনএকে পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে এসবের প্রভাবে শিশুর ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ফুসফুসের সংক্রমণ, কিডনি ও লিভার পচে যাওয়া, রক্ত সরবরাহ বিঘিœত হওয়া, অন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। ইথেফেনের কারণে ফলের পুষ্টিমান ২০-৩০ শতাংশ এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইডের কারণে তা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল স্বাস্থ্যের নার্ভাস সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কার্বাইড থেকে উৎপন্ন অ্যাসিটিলিন মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ হ্রাস করে। তীব্র পর্যায়ে এটা মাথাব্যথা, ঘূর্ণিরোগ, মাথা ঘোরা, প্রলাপ এবং এমনকি কোমার কারণ হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটা মেজাজ খিটখিটে এবং স্মরণশক্তির ক্ষতি করতে পারে। এগুলো মিশ্রিত খাবার গ্রহণের পরপরই পেটে ব্যথা, বমি ও পাতলা পায়খানা হতে পারে।

শিল্প গ্রেড ক্যালসিয়াম কার্বাইডে পরিমাণে কম হলেও অধিকতর বিষাক্ত আরসেনিক ও ফসফরাস রয়েছে যা সুস্থ ফলকে বিষময় ফলে রূপান্তর করে। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ফলে কিডনি, লিভার, ত্বক, মূত্রথলি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। কীটনাশক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর শস্য বা ফল বাজারে নেয়ার কথা থাকলেও সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় না। ২০১২ সালে দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যুর কারণ ছিল কীটনাশক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ইউনিটের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ফলফলাদি গ্রহণ করি শরীরের নানা ধরনের ক্ষয় পূরণের জন্য। কিন্তু ফরমালিন মিশ্রিত ফল বরং আরও নতুন ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়- যা মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। একজন চিকিৎসাবিদ হিসেবে আমি এখন নিরুপায় হয়ে সবাইকে পরামর্শ দেই সব ধরনের বাজারি ফল এড়িয়ে চলুন। নিজের বাড়িতে কিছু হলে খান। অথবা বাদ দেন। যদিও আমি বুঝি এটা আমাদের আগত শিশু ও নতুন প্রজন্মের জন্য খুব ক্ষতিকর। এতে আয়ুষ্কাল কমবে, দুর্বলতা বাড়বে, মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু মৃত্যু আমদানির চেয়ে ক্ষতির মধ্যে বসবাস করাকে আমি শ্রেয় মনে করি। যতদিন সরকার ফরমালিনমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারবে ততদিন এই ক্ষতি মেনে নিতে হবে।’

খাদ্যপণ্য উৎপাদনে এখন কীটনাশকের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। এসব কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব যাতে মানবদেহে না পড়ে তার জন্য কিছু নির্দেশনাও থাকে। কীটনাশক কি পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে তার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু সেগুলো মানা হয় না। বাংলাদেশে ফরমালিন আমদানি হয় প্রধানত শিল্পখাতে ব্যবহার ও পরীক্ষাগারে ব্যবহারের জন্য। শিল্পখাতে ফরমালিনের চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ টন। কিন্তু গত অর্থবছরে ২০৫ টন ফরমালিন আমদানি হয়েছে- যা চাহিদার তুলনায় চার গুণ বেশি। বাড়তি ফরমালিন খাদ্যে বিশেষ করে ফল-মূল, মাছ-মাংস, দুধ, সবজিতে ব্যবহার হচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে একটি মহল মজুদ করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগের বছর ৫০০ টন ফরমালিন আমদানি হয়। তার আগের বছর ৩০০ টন।

ফরমালিনের ক্ষতি নিয়ে গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশ হওয়ায় সরকার সম্প্রতি ফরমালিন আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিধান করে যে, টিসিবি ছাড়া অন্য কেউ ফরমালিন আমদানি করতে পারবে না। কিন্তু নানা জটিলতায় টিসিবি কর্তৃক ফরমালিন আমদানি আটকে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ফরমালিন আমদানির সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আগের দুই বছরে যে বিপুল পরিমাণ ফরমালিন আমদানি করা হয়েছিল তাই এখন বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোলা বাজারেই ফরমালিন বিক্রি হয়। পুরনো ঢাকার চকবাজার, মৌলভী বাজার, মিটফোর্ড এলাকায় পানি মিশ্রিত ফরমালিন পাওয়া যায় ৬০ টাকা লিটার দরে। বেচা বিক্রির এ কাজ হয় খুব গোপনে। পরিচিত, বিশ্বস্ত লোক ছাড়া বিক্রেতারা কাউকে ফরমালিন দেখান না। জিজ্ঞেস করলে বলেন, এগুলো কেমিক্যাল বিক্রির দোকানে পাওয়া যায়। এখানে পাওয়া যাবে না। তবে সূত্র নিশ্চিত করেছে এই এলাকা থেকেই পুরো ঢাকা অঞ্চলের প্রয়োজনীয় ফরমালিনের চাহিদার যোগান দেয়া হয়।

ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, তারা ফরমালিন দেয়াটাকে অপরাধ মনে করে না। ফরমালিনের ক্ষয়ক্ষতিটাকে খুব বেশি বড় কিছু তারা মনে করে না। ব্যবসায়ীদের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে অশিক্ষা যুক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর ১০ নং গোলচক্কর এলাকার একজন ফল ব্যবসায়ী বলেন, ‘ফরমালিন হইল গিয়া উন্নত সাইন্স। একদম হাইব্রিডের মতো। এইটা দিলেই তো ভালো। ফল মেলা দিন ভালো থাকে। তয় একটু আধটু ক্ষতি তো হয়ই। রাস্তায় নামলে বাতাসের মইধ্যেও বিষ থাকে। এইটা কোনো ব্যাপার না।’

খাদ্যে ফরমালিন বা অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক আছে কিনা জানতে যেসব পরীক্ষাগারে যেতে হয় তার অধিকাংশই কোনো কাজে লাগছে না। আগ্রহী কেউ খাবারের মান পরীক্ষা করাতে গেলে তাকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকলেও তারা নিজ উদ্যোগে খাবারের মান সংক্রান্ত কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায় না। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় সরকার ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে খাদ্যে রাসায়নিকের পরিমাণ চিহ্নিত করার একটি পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে। যা ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু জনবল নিয়োগ না হওয়ায় পরীক্ষাগারটি এখনও চালু হয়নি। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন নিজেদের উদ্যোগে একটি পরীক্ষা চালিয়েছে। যার ফলাফল এখানে দুটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলাফল ভয়াবহ। যা খাচ্ছি সবই বিষ। টাকা দিয়ে মৃত্যু কিনছি আমরা

Rajshahi Mango>

সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলছে দীর্ঘদিন ধরেই। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাউকে জিজ্ঞেস করলেই তারা বলে, ‘আমরা কাজ করছি। অচিরেই সমাধান হয়ে যাবে।’ কিন্তু আমরা দেখি অচিরেই নয়, দূর ভবিষ্যতেও কোনো কিছু সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় না। তাই জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে কিছু একটা বলে পাশ কাটানোর চেয়ে বেশি দরকার কার্যকর কিছু পদক্ষেপ। আদালতের নির্দেশ থাকলেও সরকার এখনো জেলায় জেলায় গড়ে তোলেনি কোনো খাদ্য আদালত। ভ্রাম্যমান আদালত যাদের গ্রেপ্তার করে তাদের সাজা দেয়া হয় না, অর্থ জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে না।

বিষাক্ত খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব ধনী-দরিদ্র ভেদে ভিন্ন হয় না। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। তারা অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের বাছবিচার করে না। তাই কেবল সচেতনতা দিয়েই সমাজের এই অন্যায়কে ঠেকানো যাবে না। সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য। আর এটা করতে হবে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে দেশবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যাহত হবে, এটা চলতে পারে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং কয়েকটি বাজারে ফরমালিন পরীক্ষার মাধ্যমে কিছুটা ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও এর মাধ্যমে বিষমুক্ত নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। রাসায়নিকের মিশ্রণে বিষাক্ত খাদ্যের কারণে সৃষ্ট এ বিপর্যয় রোধে সরকারিভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

‘খাদ্যে যারা বিষ দেয় আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই’
সৈয়দ আবুল মকসুদ
গবেষক, বুদ্ধিজীবী
আহ্বায়ক, বিষমুক্ত খাদ্য আন্দোলন

ফরমালিনের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা ২০০১ থেকে আমরা বলে আসছি। যারা ফল সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন বা অন্যান্য রাসায়নিক দিচ্ছে এরা আসলে ক্ষমাহীন অপরাধ করছে। লোভ-লালসা, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা এসব করছে। এদেরকে প্রতিহত করতে সরকারের যে উদ্যোগ তা সম্পূর্ণ অসন্তোষজনক। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই এসব অসাধু ব্যবসায়ী এত বড় অপরাধ করেও তেমন কোনো শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু জরিমানা হয় কিন্তু তা এহেন অপরাধের জন্য যথেষ্ট না। এই ব্যবসায়ীরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। এদের তৎপরতা বন্ধ করতে হলে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। বিদ্যমান আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আইনের সংশোধন করে শাস্তি বাড়াতে হবে। খাদ্যে যারা বিষ দেয় আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই।

‘কঠোর শাস্তির বিধান দরকার’
নির্মলেন্দু গুণ
কবি

ফরমালিনের ভয়ে তো আমি নিজে ফল খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এখানে একটা বিরাট আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কোনো কিছু খেয়ে তৃপ্তি মিলছে না। সবসময় মাথার ভেতর কাজ করছে এই বুঝি বড় কোনো রোগ বাধিয়ে ফেললাম। প্রত্যেক বাজারে ফরমালিন যাচাইয়ের মেশিন স্থায়ীভাবে বসানো দরকার এবং এই ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে যে কেউ কিছু কেনার আগে বিনামূল্যে বা দু এক টাকা ব্যয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারে। মাঝেমাঝে খবরে দেখি এই ফরমালিনযুক্ত ফল বিক্রেতাদের জরিমানা হয় ৫০০ টাকা বা তার কিছু বেশি। বলা হয় অপরাধী যখন অপরাধ স্বীকার করে তখন তার শাস্তি কম দিতে হয়। তাই যারা ফরমালিন মেশায় তারা ম্যাজিস্ট্রেট দেখলেই আগেভাগে স্বীকার করে বসে থাকে। এগুলো হাস্যকর। সরকারের উচিত কঠোর আইন পাস করা। কঠোর শাস্তির বিধান দরকার।

লিখেছেন: আনিস রায়হান  (http://www.istishon.com/node/4467)

Read 1532 times Last modified on Sunday, 01 December 2013 09:35

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.