x 
Empty Product
Friday, 23 August 2013 14:19

সোহাগী আমের সান্নিধ্য

Written by 
Rate this item
(0 votes)

চির সোহাগী আমের একটুও ধকল সয় না। প্রকৃতির সঙ্গে তাকে অনেক লড়াই করতে হয়। ভ্রূণকালে তাকে শেষ করতে চায় কুয়াশা, শিলাবৃষ্টি, প্রচণ্ড খরা। এদের একের পর এক উপদ্রবে আমের মুকুল বা গুটিগুলো অসময়ে ঝরে যায়। এই ঝরে পড়ে বলেই আমের আরেক নাম 'চূত'। আম ছাড়া অন্য কোনো মুকুল বা কচি ফলের জীবন কুয়াশায় মরে যায় না। এখন আর একটি যোগ হয়েছে- ইটের ভাটির ধোঁয়া। ফল পাকার সময় গরম তার ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু মাঘ-ফাল্গুন মাসে গাছের গোড়ায় সার ও পানি দিতে হয় বৃষ্টি না হলে। ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা বোঁটায় একটি-দুটি বা তিনটি আম যখন হাওয়ায় দুলতে থাকে তখন কী দেমাগ তার! দোলনায় গান গেয়ে দোল খাওয়ার মতো রূপের বাহার দেখায় উসকানি দিয়ে। ডাকে, 'এসো আমার ঘরে।'
 ২২শে জুনের শিবগঞ্জের সুসিদ্ধ গরমে আম শ্রমিকরা সাইকেলের দুই পাশে দুটি বড় ঝুড়িতে আম নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
 হাঁটার তালে তাল কাটলে ভারসাম্য টলমলে। রিকশা ভ্যানেও আম। ট্রাকে আম। মাথায়, কাঁধে আম অথবা খড়ের আঁটি। রাস্তা জমে যাচ্ছে। আবার জট খুলছে। মাথার ওপর গ্রহপতি সূর্যের রোদসোনা দীপক রাগে গান গাইছে। কিন্তু আমের রসের স্বাদের কাছে সূর্য তুচ্ছ। এতক্ষণ রাস্তার দুই পাশে দেখেছি বাগান। ঝুলে আছে ফলের রাজপুত্তুর। পাকা, আধাপাকা, কাঁচা। বাগানে ঢুকে যত দূর চোখ যায় আমগাছের মোটা গোড়া। কোনো কোনোটি এক শ বছুরে, কিন্তু দুর্দান্ত যুবক। না, না, এরা এই পৃথিবীর প্রথম সন্তান গাছপালার বংশধর।
 কালের কণ্ঠের ব্যুরোপ্রধান রফিকুল ইসলামকে বলে গাড়ি থামিয়ে নেমেছি। সঙ্গে আছে কালের কণ্ঠের ফটোশিকারি সালাহউদ্দীন। আম ঝুলে আছে নাকের ডগায়। সুযোগ পেয়ে মাথার চুলে আদর-থাপড় দিতে কসুর করছে না। ওটা সোহাগীর আদর-চুমো ভাবতে দোষ কী! ও সোহাগী আম, আমি পাগল হয়ে যাব। দূর থেকে তোমার সুগন্ধ পাই। তোমার পাকা রসের ধারা মত্ততা আনে। দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াকে বলা হয়েছে 'সোমধারা', অর্থাৎ অমৃত প্রসবকারী। এই সোমধারার শক্তি বল দেয়, শুক্রবহ স্রোতকে শুদ্ধ করে। এসব ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কথা। ওতে বলা আছে, রাতে ফল খেতে নেই। বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি কম, তখন বেশি খেলে উপকারের চেয়ে অপকারই বাড়বে। গাছ থেকে পাকা আম পেড়ে তিন-চার দিন বা আরো বেশি দিন রেখে চামড়া একটু কুঁচকে গেলে তখনই আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। অমৃততুল্য ও উপকারীও। আমাদের কি অত তর সয়? অপেক্ষা না করলে কি প্রকৃত সুখসম্ভোগ হয়?
 এবারের সফরসঙ্গী যুবায়ের হাসান, রফিকুল ও সালাহউদ্দীন সকালের নাশতা করেনি। ব্যস, বসে গেলাম শিবগঞ্জের ব্যস্ততম রেস্তোরাঁয়। যুবায়ের ও আমি শুধু চা। কিন্তু শিবগঞ্জের চমচম খাব না, সেই বান্দা আমি নই। রফিকরা একটার পর একটা বলছে, আমিও টপাটপ খাচ্ছি। আম তো হোটেলে খাওয়া যায় না, বাজারের আম অন্তত আট-দশ দিন পর খাওয়ার যোগ্য হবে। সকালের আমের হাট মানে লোকারণ্য। একটু পর রাস্তার অদূরে বাঁয়ে বিখ্যাত কানসাট বাজার। রাস্তার এক পাশে আমের গাড়ির শোভাযাত্রা। মিষ্টি ও চা খেয়ে আবার গাড়িতে। বাজারে এখনো ফজলি তেমন নেই। রফিক আমের বিক্রেতা থেকে দর জেনে নিচ্ছে গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে। গুটি আমের মণ ১৪০০ টাকা, ল্যাংড়া ১৮০০-২২০০, ক্ষীরসা (যাকে হিমসাগর বলে) ২২০০-২৪০০, দিলশাদ ১২০০-১৬০০, ফজলি ১২০০-১৪০০ টাকা।
 আশ্বিনা আম এখন গাছে দুলে দুলে বড় হচ্ছে। ল্যাংড়া বড়জোর আর ১০ দিন থাকবে। বাগান থেকে কাঁচা, আধাপাকা তুলে সারা দেশে চলে যাবে। বেশি পাকা বা পাকা আম খাঁচায় ভরে দূর-দূরান্তে নেওয়া যায় না। অত্যাধুনিক হিমাগার থাকলে পাকা ও সুপুষ্ট আম খেতে পেতাম। আজ পর্যন্ত দেশে আমের একটি হিমাগারও হয়নি। রফিক বলে, এখানকার আম ব্যবসায়ী ধনীরা নগদ টাকা জমিয়ে রাখার পক্ষপাতী। অন্য কোনো ব্যবসাতে খাটাতে চায় না। এ জন্য রাজশাহী, চাঁপাইয়ে তেমন করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। ব্যবসায়ীদের কোমরেই থাকে ৫০-৬০ হাজার টাকা। ওতেই যেন সুখ। দিনের শেষে হয়তো ব্যাংকে জমা দেবে।
 এখানে আমে ফরমালিন মেশানো হয় না। আড়তেও হয় না। কারণ আম বাজারে আসে শক্ত থাকতে। তাই ফরমালিন দিয়ে টাকা খরচ করতে হয় না। আমের রং সুন্দর করার জন্য কার্বাইডও এখানে মেশানো হয় না। গাছ থেকে পেড়ে এক দিনেই আম চলে আসে আড়তে। দু-এক দিনেই ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। বাজারে খালি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, আম ভর্তি হচ্ছে, আরো আসছে। মফস্বল শহরে ও রাজধানীতে ক্রেতাদের লুব্ধ করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কার্বাইড, ফরমালিন ইত্যাদি নানা ওষুধ মেশায়। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় বলবে লোকবল, আইন ও আইন প্রয়োগকারীর দোষ। এর ঘাড়ে ও, ওর ঘাড়ে সে দোষ চাপাবে। চাপান-উতোর এভাবে চলছেই।
 আমরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি বা সিলেটে বসে খাই কাঁচা আম। কিলিয়ে পাকা কাঁঠালের মতো অনেকটা। আগে দুবার আম দেখতে ও খেতে এসে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব সত্য শুনেছি। রফিকও বলেছে। আমচাষিরও একই কথা। বলে, 'আমরা কেন ওষুধ মিশিয়ে খামোকা টাকা নষ্ট করব? আমাদের কাঁচা আমই তো বেচা হয়ে যাচ্ছে। গাছ থেকে পেড়ে এক রাতও রাখতে হয় না। আর দু-এক রাতে আমাদের আম নষ্ট হবে কেন? ওসব আপনাদের ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাজ। আপনারাও দেখতে সুন্দর না হলে কেনেন না।' আর সত্যিই, আম তো এমনিতেই সুন্দরী। ওকে স্নো-পাউডার মাখাতে হয় না। ওসব মানুষ মেয়েদের জন্য। সোহাগী আমের শ্যামলী রূপ একান্তই বাংলার। মাঝে মাঝে হলুদ ওড়না, রঙিন শাড়ি গায়ে। কপালে লাল টিপ কখনো।
 রাজশাহী ও চাঁপাইয়ের আমবাগানে আমার বয়সী ও আমার চেয়ে বেশি বয়সী গাছদের দেখে আমি খুশি। সারা দেশে আমার বয়সী গাছ খুব কম। এমনকি বটগাছও দেখা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্যেও খুব কম দেখেছি। এখানে এসে আমার চেয়ে বয়স্ক গাছ দেখে আমি শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ পাই। 'আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।/সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে' গানটি গাওয়ার সাহস পাই। এ জন্য প্রখর গ্রীষ্মে আসা। নয়তো পাগল হয়ে যাব।

Read 1830 times Last modified on Tuesday, 03 September 2013 04:29

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.